সভাপতির বাণী

বাংলাদেশের গণমাধ্যম এক বৈরী ও বিপজ্জনক সময় পার করছে এখন। অনভিপ্রেত এই দুঃসময় প্রলম্বিত হয়ে চলেছে। প্রতিকূল সময়ের পাথর চেপে বসেছে সিন্দাবাদের সেই দৈত্যের মত। টানেলের অপর প্রান্তে আলোরেখার কোনো আভাস আপাতত নেই। জাতীয় জীবনে ও তৃণমূল পর্যায়ে সর্বত্রই নির্বাচনের নামে যে প্রহসন, গণতন্ত্রের নামে যে ধোঁকাবাজি, বিচারহীনতার যে সংস্কৃতির শেকড় ক্রমান্বয়ে দৃঢ়মূল হচ্ছে, তাতে উৎকণ্ঠিত হতেই হয়। আমরা জানি, রাজনীতিই সবকিছুর মূল নিয়ন্ত্রক ও নিয়ামক। সেই রাজনীতি যখন কলুষিত,অসুস্থ, প্রতিহিংসায় পরিপূর্ণ, অশ্রদ্ধেয়, পূতিগন্ধময় হয়ে ওঠে, তখন জাতির সামনে আলো এবং আশা বলতে কিছু থাকে না। শুধু পাশবিক অন্ধকারের দাপট ও দৌরাত্ম্যই প্রবলতর হয়ে উঠতে থাকে। স্বাধীনতার মূল চেতনা থেকে নষ্ট রাজনীতি আমাদের বিচ্যুত করছে বারংবার, গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির অবাধ চর্চা ও বিকাশ আমরা দেখতে পাচ্ছি না। কোনো স্বাধীন দেশ এভাবে চলতে পারে না।

বাক, ব্যক্তি ও মতপ্রকাশের প্রত্যাশিত যে স্বাধীনতা, গণতন্ত্রের সুষ্ঠু বিকাশ ও চর্চার যা আবশ্যকীয় পূর্বশর্ত, তার ক্ষেত্র আশঙ্কাজনকভাবে সংকুচিত হচ্ছে। তথাকথিত গণতান্ত্রিক মোড়কে চাতুর্যপূর্ণ যেসব কালাকানুন প্রণীত ও প্রয়োগ করা হচ্ছে, তা মোটেও মিডিয়াবান্ধব নয়। দেশের ও জনগণের সমৃদ্ধি, প্রগতি অর্জনের পথে সেসব স্পষ্টতই অন্তরায়। স্বৈরশাসনকে নির্বিঘ্ন করার লক্ষ্যে ভিন্নমত দলনের, অন্যায় অসত্য বৈষম্য অনাচারের বিরুদ্ধে ন্যায়সঙ্গত প্রতিবাদকে স্তব্ধ করার হীন উদ্দেশ্যে সেসব ব্যবহৃত হচ্ছে। গণমাধ্যম কর্মীরা হুমকি, মারধোরের শিকার হচ্ছেন প্রতিনিয়ত। এসব যেন খুবই মামুলি ব্যাপার। প্রাণহানির ঘটনা পর্যন্ত ঘটছে অবলীলায়। সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের ৭ বছর পার হলেও কোনো বিচার হয়নি। স্বাধীন একটি দেশে এত বেশিসংখ্যক সাংবাদিককে প্রাণ দিতে হবে, এমন পরিবেশ ও পরিস্থিতি কোনোক্রমেই প্রত্যাশিত ও গ্রহণযোগ্য নয়।

মিডিয়া জগতে ঈপ্সিত বিকাশ ও উৎকর্ষ অর্জন তো দূর অস্ত, অস্থিরতা, উদ্বেগ, বঞ্চনা, নৈরাশ্য, অনিশ্চয়তাই প্রবলতর হয়ে উঠছে দিন দিন। এ এক বিভীষিকা, নারকীয় দুঃসহ অধ্যায়। ছোট বড় সব হাউসে, প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় চলছে বেধড়ক ছাঁটাই, সংকোচন, বেতন ভাতার বকেয়ার পরিধি বেড়ে চলেছে। পেশাজীবনে ন্যূনতম স্বস্তি শান্তি নেই। প্রকৃত সংবাদ থেকে দেশের জনগণ বঞ্চিত থেকে যাচ্ছেন। কোথায় কী ঘটছে, কেন ঘটছে, কারা দায়ী, প্রতিকার কী হলো না হলোÑ তার বস্তুনিষ্ঠ বিবরণ, বিশ্লেষণ, পর্যালোচনা, উত্তরণের দিক নির্দেশনা বিষয়ে ইতিবাচক তথ্যাদি পাঠক-দর্শকের কাছে উপস্থাপন করা সম্ভবপর হচ্ছে না। এমন এক বেড়াজালে অত্যন্ত শঠতা ও কৌশলে আষ্টেপৃষ্ঠে মিডিয়াভুবনকে জড়িয়ে রেখেছে কালোসময়ের দানবীয় অক্টোপাস। তথ্য অধিকার থেকে যাচ্ছে আপাতঅধরা, ন্যায্য সেই আকাক্সক্ষা এখন সোনার পাথরবাটি।

মিডিয়ার স্থিতিশীলতা ও বিকাশের যা যা প্রতিবন্ধক- চিহ্নিত অচিহ্নিত সেই শত্রুদের বিরুদ্ধে সম্মিলিত সমন্বিত প্রতিরোধ, আন্দোলন-সংগ্রাম ছাড়া এই ‘স্বৈর অন্ধকার’ হঠানো কিছুতেই সম্ভবপর নয়। ক্ষুদ্র গোষ্ঠীস্বার্থ ভুলে, বৃহত্তর অর্জনের নিমিত্ত ঐক্যবদ্ধ হওয়া ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প নেই। এই দাবি যৌক্তিক ও ন্যায়সঙ্গত। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় আমরা যদি ব্যর্থ হই, ইতিহাসে এই অধ্যায় কাপুরুষতার কালো একটি অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। আমরা সেই কলঙ্ক থেকে নিজেদের মুক্ত করতে চাই। আমরা আশাবাদী, মিডিয়া এই রাহুগ্রাস থেকে মুক্ত হবে। সেজন্যে চাই সংবাদকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ নিরন্তর সংগ্রাম,অঙ্গীকার, সদিচ্ছা ও ত্যাগ।

আমরা দৈনিক আমার দেশ, দিগন্ত টিভি, ইসলামিক টিভি, চ্যানেল ওয়ানসহ বন্ধ সব মিডিয়া খুলে দেয়ার জোর দাবি জানাই। বেতন ভাতার বকেয়া পরিশোধ, নবম ওয়েজবোর্ড, উৎসব ভাতাসহ পেশার নিশ্চয়তা বিধানে সরকার ও মালিকপক্ষের প্রতি আমরা আহ্বান জানাই। সাংবাদিক হত্যা ও নিপীড়নের যত ঘটনা ঘটেছে, সবগুলোর সুুষ্ঠু তদন্ত করে দোষী ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। এই অস্থিরতা, নৈরাজ্য যদি চলতে থাকে, দেশ, জনগণ ও গণতন্ত্রই বিলুপ্তির হুমকির মুখে পড়বে, যা কোনো বিবেকবান মানুষের কাম্য হতে পারে না।

কাদের গনি চৌধুরী
সভাপতি
ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন (ডিইউজে)