মাসুম খলিলী
গণমাধ্যমকে রাষ্ট্রের চর্তু স্তম্ভ হিসেবে আখ্যা দেয়া হয়। তবে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা বা বিকাশের সাথে উদার গণতন্ত্রচর্চার একটি বিশেষ সম্পর্ক রয়েছে। বিষয়টি এমন-উদার গণতন্ত্রের চর্চা হলে গণমাধ্যমের বিকাশ ঘটে। আবার স্বাধীন ও উৎকর্ষ গণমাধ্যম গণতন্ত্রের চর্চাকে মসৃণ করে, সে সাথে সমাজে অন্যায় দুর্ভোগ বৈষম্য এমনকি অনাহার দুর্ভিক্ষ প্রতিরোধেও গণমাধ্যম বিশেষ ভূমিকা পালন করে। নোবেল বিজয়ী অমর্ত্য সেন দেখিয়েছেন, গণতন্ত্র চর্চা ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা কিভাবে দুর্ভিক্ষ থেকে রাষ্ট্রকে রক্ষা করে।
গণমাধ্যমকে বলা সমাজ বা বাস্তবতার দর্পণ। রাষ্ট্র ও জনগণের মধ্যে সেতুবন্ধন বা যোগসূত্র স্থাপনের কাজটি করে গণমাধ্যম। রাষ্ট্রের জনগণের মধ্যে দুঃখকষ্ট থাকে, প্রশাসন বা প্রভাবশালীদের অনাচার থাকে, ফসলহানির কারণে অভাব বা দুর্ভোগের সৃষ্টি হয়- এসবের প্রকাশ ঘটে গণমাধ্যমে। আর রাষ্ট্রের যারা নীতিনির্ধারক থাকেন, তারা গণমাধ্যমে প্রকাশ হওয়া চিত্র অবলোকন করে প্রতিকারমূলক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। এ কারণে গণমাধ্যমের বিকাশে গণতন্ত্র চর্চার দেশগুলোতে সব সময় ইতিবাচক নীতিসহায়তা রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে দেয়া হয়।
আনুষ্ঠানিক গণমাধ্যম সংবাদকর্মীদের জন্য নির্ধারিত আচরণ বিধি, রাষ্ট্রের বিদ্যমান আইনকানুন, জবাবদিহিতার প্রতিষ্ঠানগুলো এবং সাংবাদিকতার নিজস্ব নিয়মকানুন ও ব্যাকরণ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। এ ধরনের নিয়ন্ত্রণ গণমাধ্যমের বিকাশ রুদ্ধ করার পরিবর্তে এর উৎকর্ষ সাধন করে। গণমাধ্যম যেহেতু সমাজের অসঙ্গতি, অন্যায়, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের বিষয়গুলোও তুলে ধরে, ফলে অসাধু কায়েমী স্বার্থবাদী গোষ্ঠী গণমাধ্যমকে শত্রু বিবেচনা করে। এই বিবেচনা যখন বেপরোয়া হয়ে ওঠে, তখন গণমাধ্যম কর্মী বা গণমাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের ভয়ভীতি দেখানো এবং চাপ প্রয়োগ- এমনকি শারীরিক, মানসিক ও অর্থনৈতিক ক্ষতিসাধনের হুমকি সৃষ্টি করে। অনেক সময় এ ধরনের হুমকি বাস্তবায়নও করে। গণমাধ্যমের প্রতি এই আচরণ আনুষ্ঠানিক বিধি ব্যবস্থার গণ্ডি পেরিয়ে জোর- জবরদস্তিতন্ত্রের সূচনা ঘটায়। আইনি কাঠামো ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার কার্যকর সংরক্ষণ থাকলে এ ধরনের কর্মকাণ্ড বেপরোয়া রূপ নিতে পারে না। অন্য দিকে এই কায়েমী স্বার্থবাদী গোষ্ঠীর গণমাধ্যমবিরোধী তৎপরতায় রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতা থাকলে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও বিকাশ প্রবলভাবে বাধাগ্রস্ত হতে থাকে।
এ ধরনের কর্মকাণ্ডে বিশ্বব্যাপী হুমকির মুখে এখন গণমাধ্যমের স্বাধীনতা। সাংবাদিকদের হুমকি, জেলে নেয়া এমনকি তাদের বিবেকতাড়িত হয়ে কাজ করার জন্য হত্যাও করা হয়। গত এক দশকের যে কোনো সময়ের তুলনায় সাংবাদিকতা এখন আরো বেশি বিপজ্জনক এবং আরো অধিক হুমকির মুখে। আন্তর্জাতিক সাংবাদিক ফেডারেশন (আইএফজে) বলেছে, ২০১৮ সালে লক্ষ্যবস্তু করে হত্যা, বোমা হামলা ও ক্রসফায়ারের ঘটনায় ৯৪ সাংবাদিক ও গণমাধ্যমকর্মী মারা গেছেন। ২০১৭ সালে রেকর্ডকৃত ৮২টি হত্যাকাণ্ডের চেয়ে বেশি সাংবাদিক মারা গেছে গত বছর কর্তব্য পালনকালে। তাদের মধ্যে সাংবাদিক, ক্যামেরাম্যান ও প্রযুক্তিবিদসহ অন্যান্য মিডিয়াকর্মী রয়েছেন।
মানবাধিকার সংগঠন আর্টিক্যাল ১৯ অনুসারে, সর্বাত্মকবাদী সরকারের উত্থান এবং ইন্টারনেট সেন্সরশিপের হুমকি বিশ্বব্যাপী সাংবাদিকদের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে। সংগঠনটি আরো বলেছে, ২০১৭ সালে ৩২৬ সাংবাদিককে তাদের কাজের জন্য কারারুদ্ধ করা হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।
সরকারের মধ্যে সুশাসন প্রতিষ্ঠার সদিচ্ছা থাকলে গণমাধ্যমের সমাজ দর্পণের ভূমিকা থেকে সমাজ বাস্তবতা উপলব্ধি করে জনকল্যাণে সঠিক নীতি প্রণয়নের ব্যাপারে মনোযোগী হন নীতি প্রণেতা ও রাষ্ট্রের কর্ণধারেরা। আর এর পরিবর্তে ব্যক্তি দল বা গোষ্ঠীর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার মানসিকতা নীতিনির্ধারকদের মধ্যে প্রাধান্য বিস্তার করলে তারা গণমাধ্যমের খবর মূল্যায়ন ও সমালোচনাকে নিজস্ব প্রভাব-প্রতিপত্তি ও স্বার্থসিদ্ধির পথে বাধা হিসেবে গ্রহণ করেন। এ অবস্থায় অনেক সময় সংঘবদ্ধ শক্তি বা প্রশাসনিক ক্ষমতা দিয়ে সমালোচনা থামিয়ে দেয়ার চেষ্টা করা হয়। আবার রাষ্ট্রের আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও বিচারব্যবস্থার ওপর অন্যায় প্রভাব সৃষ্টি করে গণমাধ্যমকর্মীদের এর শিকারে পরিণত করা হয়।
এর বাইরে গণমাধ্যমকে অনুগত ও বশংবদ করার জন্য সংবাদপত্র বা ইলেকট্রনিক মাধ্যমের আয়ের উৎসকে নিয়ন্ত্রণ করার ব্যবস্থাও নেয়া হয়। বাংলাদেশের মতো তৃতীয় বিশ্বে মুক্তবাজার ব্যবস্থার পূর্ণ বিকাশ ঘটেনি। এখানে গণমাধ্যমের যে বিজ্ঞাপনের বাজার রয়েছে, তার একটি অংশ থাকে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বা করপোরেট হাউজের হাতে। বাকি একটি বড় অংশ সরকার ও সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণে থাকে। গণমাধ্যমের নীতিকে অনুগত করার জন্য শেষোক্ত টুলসটিকে সরকারের নিয়ন্ত্রকরা সরাসরি ব্যবহার করতে পারেন। আর বেসরকারি শিল্প ও করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো নানাভাবে সরকারের সেবা ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল বলে বেসরকারি খাতের বিজ্ঞাপনের বাজারে ও সরকারের এক ধরনের পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণের অবকাশ তৈরি হয়।
রাষ্ট্র পরিচালনাকারীরা সর্বাত্মকবাদী মানসিকতার অধিকারী হলে গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণে নিষিদ্ধ বা বন্ধ করে দেয়ার চূড়ান্ত ক্ষমতা প্রয়োগ না করে অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণের এই টুলসও ব্যবহার করতে পারেন। বাংলাদেশের মতো রাষ্ট্রে এই টুলস ব্যবহার করা হচ্ছে।
গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান অন্যান্য শিল্পের মতোই একটি শিল্প। যেকোনো শিল্প অর্থনৈতিকভাবে লোকসানি বা অলাভজনক হয়ে পড়লে সে প্রতিষ্ঠানের চাকরিজীবীদের ভাগ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানও অলাভজনক বা লোকসানি হয়ে দাঁড়ালে সে প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের ভাগ্যে একই ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। একই সাথে গণমাধ্যম প্রত্যক্ষ অপ্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণের মুখে পড়লে তার দর্পণের ভূমিকা আর পালন করতে পারে না। এতে রাষ্ট্র তার নীতিনির্ধারণে তৃণমূল বাস্তবতা সম্পর্কে অবহিত হয়ে নীতি প্রণয়ন বা সংশোধনের অবকাশ হারায়। গণমাধ্যমের চিরায়ত গুরুত্ব আর থাকে না।
পুরো বিশ্বকে গণতান্ত্রিক, কম গণতান্ত্রিক বা অগণতান্ত্রিক শাসনের ভিত্তিতে বিভাজন করা হলে দেখা যাবে প্রম শ্রেণীর দেশগুলোতে গণমাধ্যমের শেকড় অনেক গভীরে। এসব দেশে প্রশাসন ও গণমাধ্যমের মধ্যে একটি অনুকূল যোগসূত্র তৈরি হয়ে থাকে। গণমাধ্যমের ভূমিকা যেমন রাষ্ট্রের কল্যাণে লাগে তেমনিভাবে রাষ্ট্রও গণমাধ্যমের বিকাশে সহায়ক হয়। কম গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে বিরাজ করে মধ্যবর্তী এক অবস্থা। সেখানে গণমাধ্যম একটি নিয়ামক কাঠামোর মধ্যে থেকে তার ভূমিকা পালন করে। অন্য দিকে অগণতান্ত্রিক দুনিয়ায় গণমাধ্যম সরকারি প্রচার-প্রচারণার অংশে পরিণত হয়। বাংলাদেশ সম্ভবত প্রম শ্রেণী থেকে দ্বিতীয় শ্রেণীতে পদার্পণের পর সেখান থেকে তৃতীয় শ্রেণীর দিকে মুখ ঘুরিয়েছে।
গত এক দশকের সামাজিক গণমাধ্যমের বিকাশ প্রবণতা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় প্রমোক্ত ক্ষেত্রে সমাজে এর প্রভাব ততটা গভীর নয় যতটা অগণতান্ত্রিক সমাজে এর গভীর প্রভাব রয়েছে। কম গণতান্ত্রিক সমাজের সামাজিক গণমাধ্যমের অবস্থান দুইয়ের মাঝামাঝি।
সামাজিক গণমাধ্যম পেশাদার নিয়ন্ত্রক দ্বারা নিয়ন্ত্রিত নয়। যেকোনো এক ব্যক্তি ইচ্ছা করলে অথবা তিনি যেমন দেখেছেন তেমন একটি ঘটনার বর্ণনা দিয়ে দিতে পারেন। এতে তথ্যের যথার্থতা যাচাইয়ে চেষ্টা খুব বেশি থাকে না। অন্য দিকে গণমাধ্যমকর্মী ঘটনা প্রত্যক্ষ করে অথবা বিশ্বাসযোগ্য সূত্র থেকে তথ্য সংগ্রহ করে সেটি যাচাই-বাছাই করে পরিবেশন করেন। ফলে আনুষ্ঠানিক গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা আর সামাজিক গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা এক নয়। গণতন্ত্রচর্চার দেশগুলোতে আনুষ্ঠানিক গণমাধ্যমের প্রভাব থাকে বেশি আর সামাজিক গণমাধ্যমের প্রভাব থাকে কম। অন্য দিকে অগণতান্ত্রিক দেশগুলোতে মানুষ তথ্যপ্রাপ্তির জন্য সামাজিক গণমাধ্যমের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। এই নির্ভরতা নানাভাবে বিভ্রান্তিও সৃষ্টি করে। প্রকৃত তথ্যপ্রবাহকে গুজব ও অযথার্থ তথ্য অনেক সময় আড়াল করে ফেলে।
বাংলাদেশে গণতন্ত্রচর্চার প্রতিষ্ঠানগুলো একের পর এক হুমকির মুখে পড়ছে। বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন ব্যবস্থা উদার গণতন্ত্রচর্চার প্রাণস্বরূপ। সেই ব্যবস্থা এখন ভেঙে পড়ার উপক্রম। জনগণ তার ভোটাধিকার প্রয়োগে প্রধান বাধা হিসেবে পেয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে। ফলে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার কাঠামোর মধ্যেই বিপত্তি গভীর হয়ে উঠছে। এর সাথে সমান্তরালভাবে এগিয়ে চলছে গণমাধ্যমের সামনে হুমকি। জোর-জবরদস্তিতন্ত্র যেভাবে নির্বাচনব্যবস্থাকে জনগণের কাছে আস্থাহীন করে তুলেছে, তেমনিভাবে গণমাধ্যম নেটওয়ার্ককেও তা নানাভাবে আক্রান্ত করছে। স্বাধীন গণমাধ্যমগুলো এর মধ্যে রাষ্ট্রের চাপ ও অর্থনৈতিক বয়কট ধরনের পরিস্থিতির মধ্যে পড়ে অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য লড়াই করছে।
এ অবস্থায় রাষ্ট্রের গণতন্ত্রচর্চা এবং গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান ও সংবাদকর্মী সবাই এক অনাকাক্সিক্ষত বিপদের কবলে। কত দিনে সেই বিপদ কাটবে কে জানে?
লেখক : দৈনিক নয়া দিগন্তের ডেপুটি এডিটর, কলামিস্ট।